বিএনপি’র ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলন ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি’! কম দামি চাদর পুড়িয়ে নয়, মোটরসাইকেল ও গাড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বর্জন করে আন্দোলনে নামা উচিত বিএনপির

0
36
পণ্য বর্জন

অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর জিয়াউর রহমান দেশের বাজারে ভারতের সবধরনের পণ্য আসার সুযোগ করে দিলেও বর্তমানে তারই প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি ভারতের পণ্য বর্জনের ডাক দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই কাণ্ডকে নিছক রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি হিসেবেই দেখছেন।

সাধারণ নাগরিকদের প্রশ্ন, দেশের বাজারে চিনি, চিনির তৈরি মিষ্টি, গম, গম থেকে তৈরি করা আটা ময়দার কোন খাদ্য, পেঁয়াজ, গরম মসলা, জিরা, বাসমতি চালসহ বহু পণ্য আসে ভারত থেকে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের রাস্তায় সবচাইতে বেশি ভারতীয় বাইক দেখা যায়। এছাড়াও ভারতীয় অন্যান্য যানবাহন তো আছেই। ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক দিয়ে বিএনপি ও তাদের দলের নেতাকর্মীরা এসব পণ্য ব্যবহার করা কি বাদ দিয়েছেন?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রশ্ন উঠেছে, দেশ থেকে ঈদসহ নানা উৎসবকে কেন্দ্র করে বিএনপির যেসব নেতাকর্মীর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা শাড়ি কাপড়সহ ভারতের প্রসাধনী সংগ্রহ করেন, সেগুলো কি তারা পুড়িয়ে ফেলবেন?

এ প্রসঙ্গে তাবজিরুল নামের ঢাকার এক নতুন ভোটার হওয়া তরুণ বলেন, ‘কম দামি চাদর পুড়িয়ে নয়, মোটরসাইকেল ও গাড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বর্জন করে আন্দোলনে নামা উচিত বিএনপির। শুধু একটা চাদর পুড়িয়ে আবার ভারতীয় বাইকে করে রেলি করা হলে বিষয়টা হাস্যকর হয়ে যায়।

গত ২০ মার্চ ঢাকায় ৩৩ ডিগ্রি অর্থাৎ উষ্ণ আবহাওয়া থাকলেও ভারতীয় চাদর নিয়ে কর্মসূচিতে আসেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এরপর সেই ‘ভারতীয় চাদর’ জনসম্মুখে ছুড়ে ফেলে দেশটির পণ্য বর্জনে চলমান ক্যাম্পেইনে সংহতি জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের ওয়েব টিমের সমন্বয়ক তন্ময় আহমেদ বলেন, বিএনপির- ছাত্রদল ও যুবদল নেতারা ইন্ডিয়ান বাইকে ঘুরে সারাদিন। ওইগুলাও তাদের নিজেদের পোড়ানো উচিত , যদিও বাস, বাইক, গাড়ি এসব পোড়ানো তাদের অভ্যাস। বিএনপি যেন রোজার সময় ভারতীয় চিনি, চিনির তৈরি মিষ্টি, গম থেকে তৈরি করা আটা-ময়দার কোন খাদ্য, পেঁয়াজ, গরম মসলা, জিরা, যা যা ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য এই দেশে আসে, বাসমতি চালসহ এগুলি যেন ভারতের পণ্য হিসেবে না খায়।

রিজভীর এমন কাণ্ড রীতিমত হাস্যরস তৈরি করেছে রাজনৈতিক মহলে। তারা বলছেন, প্রথমত রিজভী ভারতের ওই চাঁদর কিনেছেন। শুধু পুড়িয়ে দিতে! এর বদলে তার উচিত ছিল সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা যে ভারতীয় বাইকগুলো নিয়ে এসেছে সেগুলো পুড়িয়ে দেওয়া।

কম দামি চাদর পুড়িয়ে নয়, মোটরসাইকেল ও গাড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য বর্জন করে আন্দোলনে নামা উচিত বিএনপির

বিএনপি’র আন্দোলন প্রসঙ্গে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখছেন, বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই তো জ্বালাও পোড়াও। তাই এই দলের নেতাকর্মীরা ভারতীয় মোটরসাইকেল, গাড়িসহ দামি যানবাহন ব্যবহার করেন, সেগুলো তারা পুড়িয়ে ফেলতে পারেন। জনগণের জানমালের ওপর তাদের এই জ্বালাও পোড়াও অত্যাচার না করে নিজেদের কাছে যে সকল ভারতীয় বাইক গাড়ি বা দামি পণ্য আছে সেগুলো জনসমক্ষে এসে পুড়িয়ে তারা প্রতিবাদ জানাতেই পারে।

বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যের বাজারে ভারতের বড় ধরণের অংশীদারত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু খাদ্য পণ্য ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারত থেকে প্রায় ১৪০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ।

সহজে জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য ভারতের বিরোধিতা করা সহজ দাবি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ গণমাধ্যমে এ সম্পর্কে বলেন, বিএনপি হয়তো নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে সেই পথটিই বেছে নিয়েছে। তবে আমি বলবো এগুলো বর্তমান বিশ্বে তেমন কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারবে না।

তিনি বলেন, আমাদের দেশের জনগণকে আমার এতোটা বোকা মনে হয় না যে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি প্রচারণা দেখে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিবে। কিন্তু এটা সত্য যে, বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা করে জনপ্রিয়তা পাওয়া সহজ। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত আরো বিচার-বিশ্লেষণ করে বক্তব্য দেওয়া।

বিএনপি’র ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলন ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি’!

শুধু এই রাজনৈতিক বিশ্লেষকই নন। বিএনপির ভারত বিরোধীতার এই হাঁকডাককে সচেতনমহল স্ট্যান্ডবাজি হিসেবেই মনে করছেন। আর এমন হটকারী কর্মকাণ্ডে আখেরে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেই মনে করছেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল বলেন, বাংলাদেশের জন্য ইন্ডিয়া আউট অন্যার্থে ভারত বিরোধী আন্দোলন নতুন কিছু নয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে আমরা এটা দেখছি। এটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও একটি নির্দিষ্ট শক্তি এই ভারত বিরোধী রাজনীতিকে পুঁজি করে এগিয়ে গেছে।

নির্বাচনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপিকে সমর্থন করা বেশ কিছু অ্যাক্টিভিস্ট ভারত বয়কটের ডাক দিলে সেটিতে প্রকাশ্যেই পক্ষে অবস্থান নেন বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। তবে কৌশলে দলের শীর্ষ নেতারা এটিকে নিজেদের আন্দোলন হিসেবে ঘোষণা না করে নিশ্চুপ থাকেন। কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমে বিএনপির সম্পৃক্ততা ফাঁস হলে শেষমেশ খোলস ছেড়ে সরাসরিই ভারত বিরোধীতা শুরু করেন বিএনপির নেতারা। যদিও তাদের অনেকেই চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নানা কারণে ভারতে নিয়মিত যাতায়াত করেন। এমনকি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও দলীয়ভাবে ভারতের সঙ্গে গোপনে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে বিএনপি সিঙ্গাপুরে এক গোপন বৈঠকে। তবে ভোট বিরোধী অবস্থানে সুবিধা না করতে পেরে এবার ভারত বিরোধীতা রাজনীতিতে নেমেছে তারা।

আরও পড়ুনঃ

বিএনপির দুর্ভিক্ষের গুজব ও দেশে খাদ্য মজুদের বাস্তব চিত্র

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা এখন তলানিতে

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা এখন তলানিতে

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here