ছাত্রদলের জন্মকথা ও শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাসের বীভৎস অধ্যায় 

0
189
ছাত্রদল

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের নির্মমভাবে হত্যা এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে জেলের মধ্যে খুনের পর, গণহারে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রেফতার করা হয়। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের নির্দেশে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো থেকে প্রগতিশীল ও মুক্তিযোদ্ধাদের অপসারণ করা হয়। এমনকি জিয়ার সঙ্গে যোগ না দেওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আব্দুল মতিন চৌধুরীকে ১৯৭৬ সালের ৫ জুন গ্রেফতার করা হয়। এরপর প্রচলিত আইনকে পাশ কাটিয়ে মার্শালে কোর্টে গোপন বিচার সাজানো হয় তার নামে। এরকম আরো অনেক বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির কণ্ঠস্বর রোধ করে দিয়ে ভয় সৃষ্টি করা হয় জনমানুষের মনে।

একই সঙ্গে চলতে থাকে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে রাখার নীলনকশা তৈরি। তারই অংশ হিসেবে, নিজস্ব লাঠিয়াল বাহিনী তৈরির জন্য ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান গঠন করে ছাত্রদল নামক এক দানবীয় বাহিনী। যাদের হাত ধরে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সন্ত্রাসের রাজত্ব চেপে বসে। অবশ্য এর আগে গ্রামভিত্তিক টাউটদের নিয়েও বিশেষ বাহিনী গঠন করেছিল সে। 

রাজনীতিবিমুখ জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে প্রথমে গ্রামভিত্তিক সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরলপ্রাণ জনতার মনে ভয়ের বীজ বপন করে। গ্রাম-প্রতিরক্ষা বাহিনীর নামে প্রতিটি গ্রামে নিজের এজেন্টদের নিয়োগ দেয় সে। সেই বাহিনীর সদস্যদের হাতে হাতে তুলে দেওয়া হয় লাঠি ও রেডিও। যাতে তৎকালীন একমাত্র জরুরি যোগাযোগ মাধ্যম রেডিও মারফত যে কোনো নির্দেশ দিতে পারে সে, এবং সেই আদেশ পেয়ে তার মনোনীত পেটোয়া বাহিনী যেনো সাধারণ জনতাকে অস্ত্রের মুখে দ্রুত জিম্মি করতে পারতে পারে।

আরও পড়ুনঃ ‘স্বৈরশাসক জিয়া জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে’

এভাবে ক্ষমতা দখলের পটভূমি তৈরির পর, ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি সায়েমকে পদচ্যুত করে অসাংবিধানিকভাবে নিজেই নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে জিয়াউর রহমান। এরপর ১৯৭৮ সালে নাটকীয়ভাবে ‘জাগদল’ নামক একটি দল গঠন এবং নিজস্ব পেটোয়া বাহিনীর মাধ্যমে ‘হ্যাঁ/না’ নামক এক তামাশাময় ভোটের আয়োজন করে। দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থাকে কফিনে ঢুকিয়ে রেখে, বিভিন্ন দল থেকে সুবিধাবাদী লোকদের একত্রে করে সেই বছরই ‘বিএনপি’ গঠন করে স্বৈরাচার জিয়া।

কিন্তু জিয়াউর রহমান বুঝতে পারে যে, এই দেশের শিক্ষিত ও মেধাবী তরুণপ্রজন্মকে বিপথে নিতে না পারলে তার পক্ষে বেশিদিন অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলে রাখা সম্ভব হবে না। তাই ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি ন্যাপ (ভাসানী), ইউনাইটেড পিপিলস পার্টি ও জাগদলের সঙ্গে থাকা ছাত্রদের নিয়ে ‘ছাত্রদল’ গঠন করে সে। এরপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হাতে অস্ত্র ও অগাধ অর্থ তুলে দেয়। নতুন নতুন মোটরসাইকেল নিয়ে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে শুরু হয় কালো-চশমা পরিহিত ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের মহড়া।

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্ত্রের মহড়া শুরু হয় ছাত্রদলের ক্যাডারদের মাধ্যমে; শুরু হয় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি। যে ধারাবাহিকতায়, আজও কথায় কথায় জ্বালাও-পোড়াও, ধ্বংসযজ্ঞ ও মানুষকে হত্যার হুমকি দেয় ছাত্রদলের দুর্বৃত্তরা। কারণ এটি কোনো গতানুগতিক দল নয়, এদের কোনো আদর্ম নেই, এটি শর্টকার্টে বড়লোক হওয়ার অতিলোভীদের একটি নষ্ট চক্র। অস্ত্রবাজি, খুন, সন্ত্রাসবাদ ও দুর্বৃত্তায়ন করাই এদের একমাত্র লক্ষ্য। 

ছাত্রদল ঢাবিতে লাশের রাজনীতি করতে চাচ্ছে: ছাত্রলীগ | DU | Chatra League

স্বৈরাচারের সিকিউরিটি গার্ড: আইয়ুব খানের এনএসএফ, জিয়াউর রহমানের ছাত্রদল

১৯৮১ সালে সরকারি জাহাজ ‘হিজবুল বাহার’-এ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রমোদ ভ্রমণ শুরু করে জিয়াউর রহমান। এই ভ্রমণের ছদ্মবেশে ভালো রেজাল্টধারী ছাত্রছাত্রীদের সামনে দ্রুত অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার মালিক হওয়ার প্রলোভন দেখায় সে। ভ্রমণ শেষে পরবর্তীতে তাদের অধিকাংশই ছাত্রদলের সঙ্গে যুক্ত হয়। পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান যেমন বাঙালির জাগরণ ও মুক্তির আন্দোলন দমানোর জন্য এনএসএফ প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং সেই দলের ছদ্মবেশে খোকা ও পঁচাত্তর খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতা করতো; তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশেও একইরকম ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছিল জিয়াউর রহমান। জিয়ার ব্রেনচাইল্ড হিসেবেই পরবর্তীতে সৃষ্টি হয়েছিল বাবলু-অভি-নীরুদের মতো সন্ত্রাসী।

ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমানের প্রমোদ ভ্রমণের ‘হিজবুল বাহার’ নামক জাহাজে যেসব মেধাবী ছাত্র একবার উঠেছিল, পরবর্তীতে তারা একেকজন পরিণত হয়েছিল বর্বর খুনি ও সন্ত্রাসীতে। অতি সুকৌশলে তাদের কাছ থেকে শিক্ষার কলম ছিনিয়ে নিয়ে, সন্ত্রাসের জন্য আধুনিক অস্ত্র তুলে দিয়েছিল জিয়া। তরুণপ্রজন্মকে বিপথে ধাবিত করে নিজের ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে পাকাপোক্ত করতে চেয়েছিল সে। কিন্তু সামরিক বাহিনীর এক অভ্যুত্থানে নিজের লোকদের হাতেই জিয়ার মৃত্যু হওয়ায়, দীর্ঘদিন ক্ষমতা দখল করে রাখার স্বপ্ন বিফলে যায় তার। তবে তার রেখে যাওয়া অস্ত্র ও অর্থের ঝনঝনানিতে আরো বড় ত্রাসে পরিণত হয় ছাত্রদল। ক্যাম্পাসকে রণক্ষেত্রে পরিণত করে বাবলু-নীরু-অভিদের মতো ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা। শিক্ষাঙ্গনে তারা একের পর এক চালাতে থাকে কিলিং মিশন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে তারা পরিণত করে চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজির ঘাঁটি হিসেবে। ছাত্র রাজনীতির ছদ্মবেশে উচ্চাভিলাষি দুর্বৃত্তের পাইপলাইনে পরিণত হয় ছাত্রদল।  

      

স্বৈরশাসক জিয়ার ভোটারবিহীন হ্যাঁ-না ভোটের নির্বাচনের ইতিহাস

[ছাত্রদলের জন্মকথা ও শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাসের বীভৎস অধ্যায় ]

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, আদর্শের বদলে অর্থ দিয়ে রাজনীতি করার ধারা শুরু করেছিল জিয়াউর রহমান। তার মৃত্যুর পর বিএনপির পক্ষ থেকেও এই সন্ত্রাসবাদকে আরো উস্কে দেওয়া হয়। রাজনীতিতে অস্ত্র, পেশীশক্তি, কালো টাকার ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনীতিকে কলুষিত করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বিএনপি, তারই ধারাবাহিকতাতে এই আধুনিক যুগে এসেও ক্যাম্পাসে প্রাণ দিতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ২০০২ সালে বুয়েটে টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলির সময় মারা যান সাধারণ শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনি।

এমনকি আজো ১৯৭৫-এর বর্বর ও জাতীয় লজ্জাজনক ঘটনার মতো হত্যাকাণ্ড ঘটানোর হুমকি দিতেও বিবেকে লাগে না ছাত্রদলের। কারণ তাদের মধ্যে একজন মানুষ হওয়ার মতো বিবেকটুকুও অবশিষ্ট নেই, মনুষ্যত্ব বিসর্জনের মাধ্যমেই ছাত্রদলের হাতেখড়ি নিতে হয়। জিয়াউর রহমানের তুলে দেওয়া অস্ত্রে-অর্থে-কূটচালে আজও দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের জীবন কীভাবে শেষ করে দেওয়া হয়, তা দেখতে চাইলে ছাত্রদলের ইতিহাস ঘাঁটুন, এদের প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকুন।   

আরও পড়ুনঃ

বাংলাদেশের গণতন্ত্র সর্বনাশ করেছিল জিয়াউর রহমান   

গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক দলের কণ্ঠরোধ করেন জিয়াউর রহমান

কিভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল ডিক্টেটর জিয়া

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here