নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব আর গ্রুপিং, ভাঙনের মুখে বিএনপি!

0
2619
বিএনপি

মুখে-মুখে ঐক্যবদ্ধ বললেও ভেতরে ভেঙে চৌচির বিএনপি! বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজনীতিতে নেই ২০১৮ থেকে। জেল থেকে হাসপাতাল, হাসপাতাল থেকে বাড়ি, বাড়ি থেকে আবার হাসপাতাল- এভাবে চলছে তার জীবনের শেষ সময়টুকু। আর পুত্র তারেক রহমান চিকিৎসার নামে মুচলেকা দিয়ে দেশ ছেড়ে পলাতক ২০০৮ সাল থেকে।

দলের শীর্ষ দুই নেতার এমন পরিণতির পর মূলত নেতৃত্বের লড়াই, পদ, মনোনয়নসহ মত পার্থক্যের কারণে ভেতরে ভেতরে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে রেষারেষি। এক যুগের চেয়েও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির নেতারা মুখে মুখে ঐক্যের কথা বলা হলেও ভেতরে ফাটল ধরেছে অনেকেদিন ধরেই। ফলে গ্রুপিং আর বিবাদ থামছে না।

এর ফলাফল দেখা গেছে মাঠের রাজনীতিতে। খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন জমাতেই পারেনি দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রাজনৈতিক দলটি। মাঝে মাঝে ঢাকার নেতারা রাজপথে নিজেদেরকে একটু দেখা দেন, নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং, সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বিষোদ্‌গার করে আবার ঘরে ফিরে যাওয়া তাদের রুটিনওয়ার্ক। আবার মাঝে মাঝে একটু বড়সড় সমাবেশ ডেকে কর্মীদের আশ্বস্ত করেন, দল এখনও টিকে আছে। তবে সেসব সমাবেশে থাকে না কোনো গোছানো কর্মসূচি। কেউ খালেদা জিয়া, কেউ তারেক রহমান সেজে হেঁটে বেড়ান সেসব সমাবেশে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর গণমাধ্যমে চলে ব্যাপক হাস্যরস।

দলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া সিনিয়র কয়েকজন নেতা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, বিএনপি যতই আন্দোলনমুখী হচ্ছে ততই বিভক্তি প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে। যেখানেই সভা সমাবেশ হচ্ছে, সেখানেই হাতাহাতি আর মারামারি হচ্ছে। খোদ কেন্দ্রীয় নেতাদের সামনেই ঘটছে এসব। একপক্ষ অন্যপক্ষের ওপর চড়াও হচ্ছে। কখনও তাদের হুড়োহুড়িতে স্টেজ ভেঙে পড়ছে। কখনওবা চেয়ার ছোড়াছুড়ি চলছে। এতেই বোঝা যায় দলের কী অবস্থা।

ইতিমধ্যে কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার অনুসারীরা এবং তার পক্ষের লোকজন আলাদাভাবে বৈঠক করছেন। অন্যদিকে দলের অন্যতম সিনিয়র নেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন তার বাসভবনে বিএনপির আরেক গ্রুপের নিয়মিত বৈঠক করছেন এবং রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে আলাপ আলোচনা করছেন।

রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কাগজে-কলমে বিএনপি নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ দাবি করলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া না গেলে দলটি ভেঙে উপদলে বিভক্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এই বিভক্তি প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে খুলনার বিএনপির অন্যতম প্রভাবশালী জনপ্রিয় নেতা নজরুল ইসলাম মঞ্জুর অব্যাহতির মধ্যে দিয়ে। তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি বিএনপির অধিকাংশ নেতা-কর্মী ভালোভাবে নেয়নি।

শুধু নজরুল ইসলাম মঞ্জু নয়, এর আগে বিএনপি নেতা শওকত মাহমুদ এবং মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল। এমনকি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা নেতা মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছিল। তারেক-রহমানএই বিষয়গুলো নিয়ে বিএনপিতে দীর্ঘদিন ধরে উত্তাপ-উত্তেজনা চলছিল। কিন্তু যেহেতু বিএনপি কোনরকম কর্মসূচির মধ্যে ছিলো না, সেই জন্য এই ধরনের বিভক্তি এবং মতপার্থক্য প্রকাশ্য রূপ নেয়নি। কিন্তু এখন যখন বিএনপি প্রকাশ্য আন্দোলনের পক্ষে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন স্থানে সভা সমাবেশ করছে, তখন বিএনপির বিভক্তি প্রকাশ্য রূপ ধারণ করছে।

সম্প্রতি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বাসভবনে বিএনপির একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া নিয়ে বিএনপি ভুল পথে পরিচালিত হচ্ছে বলেও কয়েকজন নেতা মন্তব্য করেছেন। তাদের সঙ্গে একমত হয়েছেন বিএনপির সিনিয়র নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

তিনি বলেন, এই রকম আন্দোলন করলে খালেদা জিয়ার মুক্তিও যেমন হবে না, তার চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর দাবিতেও কান দেবে না সরকার। সেই সাথে সরকারের পতন হবে না। এই গ্রুপের নেতারা মনে করছেন, বিএনপি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না, কারণ জনপ্রিয়, দক্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দের কণ্ঠ চেপে ধরা হচ্ছে। তাদেরকে কাজে লাগানো হচ্ছে না। পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতাদেরকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

বিভিন্ন জায়গায় টাকার বিনিময়ে কমিটিতে ঠাঁই পাচ্ছেন ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাহীন লোকজন। কখনও রাজনীতি করেননি, তারাও পদ পেয়ে যাচ্ছেন দলে ঢুকেই। অন্যদিকে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অনুসারীরা মনে করছেন, ধাপে ধাপে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। খালেদা জিয়ার ইস্যুটি একটি ইস্যু মাত্র, একে ধরে সংগঠন গোছাতে হবে।

মির্জা ফখরুল এবং ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনপন্থীদের মাঝে মূল পার্থক্য কর্ম পরিকল্পনায়। ফখরুলপন্থীরা মনে করছেন, সংগঠন গোছানোই হলো প্রধান কাজ। আগে সংগঠন গোছাতে হবে, তারপর ধাপে ধাপে আন্দোলন করতে হবে। অন্যদিকে মোশাররফপন্থীরা মনে করছেন, সংগঠন গোছানোর সময় এখন নেই। এখনই চূড়ান্ত আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আর এ কারণে কঠোর কর্মসূচি দিতে হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সরকার পতনের আন্দোলনকে একসূত্রে গাঁথতে হবে।

জানা গেছে যে, ফখরুল গ্রুপই নিজেদেরকে তারেক রহমানের সহি অনুসারী বলে মনে করেন। তারেক রহমান যে যেরকম নির্দেশ দিচ্ছেন, তারা সেটি প্রতিপালন করছেন। ফলে বিএনপির সত্যিকারের দ্বন্দ্ব হলো ‘গা বাঁচিয়ে চলো’ নীতিতে বিশ্বাসী তারেক রহমানের ফোরাম বনাম খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য ‘এখনই আন্দোলনের সময়’ ফোরামের মাঝে।

তারেক রহমানের লক্ষ্য বিভিন্ন ইস্যু সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে তা আগামী নির্বাচনের হাতিয়ারে পরিণত করা। সেজন্য দেশি-বিদেশি নানামুখী চক্রান্তের মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই সরকারকে বিপাকে ফেলতে চান তিনি। যদিও বিএনপির অধিকাংশ নেতা-কর্মী মনে করেন, তারেক রহমানের এসব ফর্মুলা আগের মতই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এসব দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে টলানো সম্ভব না। উল্টো বুমেরাং হয়ে বিএনপিকেই দিন দিন কোণঠাসা করে ফেলছে।

ফলে বিএনপির এমন সমাবেশ, কয়েক ঘণ্টার অনশন, বিক্ষোভ কর্মসূচির নামে হাস্যকর ও ফলাফলহীন আন্দোলনে কেবলই হতাশাগ্রস্ত হবে নেতা-কর্মীরা। তাতে দলের মধ্যে বিভক্তি আরও প্রকাশ্য হবে।

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here