ফ্রিডম পার্টি: খুনিদের দল গঠনের কলঙ্কজনক অধ্যায় ও চলমান অপতৎপরতা

0
24

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যখন শূন্য হাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন, ঠিক সেই সুযোগে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় দেশবিরোধীরা। যুদ্ধ-পরবর্তী একটি দেশের সামাজিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে, বাংলাদেশবিরোধী আর্ন্তজাতিক চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজেদের সংগঠিত করে তারা। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা মোকাবিলা করে বঙ্গবন্ধু প্রায় গুছিয়ে আনছিলেন সবকিছু। শুরু করেছিলেন দেশ গঠনের দ্বিতীয় বিপ্লব। দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মযজ্ঞ শুরু করার কয়েকমাসের মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে। আপামর জনতার ঘরে ঘরে স্বাধীনতার সুফল পৌঁছে দেওয়ার জন্য নতুন করে তৈরি করা হয় জনবান্ধব প্রশাসনিক কাঠামো। কিন্তু এটি বাস্তবায়নের ঠিক আগের রাতেই ঘটে যায় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়।

বাঙালি জাতি যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, সেজন্য স্বাধীনতার পর থেকে সক্রিয় কুচক্রীরা চূড়ান্ত আঘাত করে বাংলাদেশের হৃদপিণ্ডে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, ইতিহাসের বর্বরোচিত সেই কালরাতে সপরিবারে হত্যা করা বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও বাঙালির মুক্তিদাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু খুনিচক্র এখনো থেমে নেই। সুযোগ পেলেই খুনের বারবার নেশায় মেতে উঠেছে তারা। এদের রক্তপিপাসু আত্মা দেশের উন্নয়ন সহ্য করতে পারছে না। বিদেশে বসে এখনো আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে এই খুনি ও তাদের পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিনিধিরা।

ফ্রিডম পাটি আসলে কারা

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেছিল যেসব নরপিশাচ, তারাই পরবর্তীতে ফ্রিডম পার্টি নামে একটি দল গঠন করে। ১৫ আগস্টের খুনিচক্রের সদস্য ও হঠকারী সেনাকর্মকর্তা খন্দকার আবদুর রশিদ, সৈয়দ ফারুক রহমান, বজলুল হুদার নেতৃত্বে এই দল প্রতিষ্ঠা করা হয়। খুনিচক্রের অন্যান্য আরো কিছু সদস্য এবং তাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত কিছু ব্যক্তি এই দলের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যায়। এমনকি দেশের বিভিন্ন স্থানের চিহ্নিত দাগী সন্ত্রাসী ও দুর্বত্তদের সঙ্গে নিয়ে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল এই কুচক্রীরা।

পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে ধানমণ্ডির সেই ৩২ নম্বর বাড়িতেই প্রকাশ্যে স্লোগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার মিশন চালায় তারা। এমনকি ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার ভাগ্নে ও তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপসকে হত্যার চেষ্টা করা হয় বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি শরিফুল হক ডালিমের ভাই কামরুল হক স্বপন, খুনি খন্দকার আবদুর রশিদের মেয়ে মেহনাজ রশীদের নেতৃত্বে। এখন অস্ট্রলিয়ায় বসে এই খুনিদের দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছে বঙ্গবন্ধুর খুনি লে. কর্নেল ফারুকের ছেলে সৈয়দ তারিখ রেহমান।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনিদের নিরাপদ জীবন ও ফ্রিডম পার্টি প্রতিষ্ঠা

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর নিরাপদে দেশত্যাগ করেছিল খুনিরা। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব খন্দকার মোশতাক আহমেদ এবং খুনের অন্যতম মদতদাতা ও পরবর্তীতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সহায়তায় দেশত্যাগ করতে পারে খুনিরা। জিয়াউর রহমানের হস্তক্ষেপে লিবিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি আশ্রয় পায় এই খুনিদের একটা বড় অংশ। এসময় লিবিয়ার একনায়ক গাদ্দাফির পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ, কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমানসহ অন্যান্য খুনিরা।

এমনকি দেশের ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরাচার জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় তারা জনশক্তি রফতানির কোম্পানি খোলে এবং বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় লোক পাঠানোর ব্যবসা করে। এছাড়াও কন্সট্রাকশান কোম্পানিসহ বিভিন্ন কোম্পানি খুলে ব্যবসা করে অনেক টাকার মালিক হয় তারা এই সময়ে। এমনিক তাদের সমর্থকদের লিবিয়ায় নিয়ে অস্ত্র চালনার অত্যাধুনিক ট্রেনিং দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থাও করে এই রশিদ-ফারুক চক্র।

এরপর আরেক স্বৈরাচার এইচ এম এরশাদের সময় সুযোগ বুঝে দেশে ফিরে আসে এই খুনিরা। ১৯৮৭ সালে ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বসে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্রিডম পার্টি’ নামের একটি দলের নাম ঘোষণা করে খুনি রশিদ-ফারুক ও বজলুল হুদারা। সেসময় তাদের উপস্থিতিতে আবারো এই নতুন করে সংগঠিত হতে থাকে বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিরা।

প্রকাশ্যে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করে এই খুনিরা

ফ্রিডম পার্টির নামে রাজনৈতিক দলের ছদ্মবেশে আবারো প্রকাশ্যে ঘুরতে থাকে বঙ্গবন্ধুর এই চিহ্নিত ও আত্মস্বীকৃত খুনিরা। সেসময় স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য রাজপথে সক্রিয় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা। এই খুনিরা চেয়েছিল, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে হত্যঅর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর রক্তের ধারা শেষ করে দিতে।

এই মিশন বাস্তবায়নের জন্য ১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট মধ্যরাতে দলবল নিয়ে ফের হামলা করে তারা। সেই রাতে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে গুলি ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করে ফ্রিডম পার্টির খুনিরা। কিন্তু ওই হামলা প্রতিহত করে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রক্ষা করেন নিরাপত্তারক্ষী ও সমর্থকরা। সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের পাল্টা গুলিবর্ষণের ফলে খুনিরা এবার আর সফল হতে পারেনি। মিশনে ব্যর্থ হয়ে ‘ফারুক-রশীদ, জিন্দাবাদ’, ‘ফ্রিডম পার্টি, জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে দিতে চলে যায় তারা।

এখন কী করছে এই খুনিচক্রের সদস্যরা

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ফ্রিডম পার্টির প্রকাশ্য তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর তাদের সহায়তায় আবারো পুনর্গঠিত হয় ফ্রিডম পার্টির খুনিরা। এবার আরো চতুরতার সঙ্গে সক্রিয় থাকে তারা। বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে যুথবদ্ধ হয়ে দেশের বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠী মদত দেয় তারা। এসময় শেখ হাসিনার ওপর বিভিন্ন সময় হামলা হয়। একাধিকবার হত্যার চেষ্টা করা হয় বিরোধিদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে। কিন্তু কখনো ভাগ্য এবং কখনো নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ত্যাগের বিনিয়ম প্রাণে রক্ষা পান শেখ হাসিনা।

২০০৯ সালে আবারো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ফের আত্মগোপনে চলে যায় এবং অন্যান্য দলের মধ্যে মিশে যেতে থাকে ফ্রিডম পার্টির খুনিরা। পরিচিত প্রধান মুখগুলো বিদেশ চলে যায়। কিন্তু তাদের নাশকতার পরিকল্পনা থেমে থাকে না। দেশে অবস্থান করে দলকে গোছানোর চেষ্টা করে খুনি রশিদের মেয়ে মেহনাজ রশীদ। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নে শেখ ফজলে নূর তাপসকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায়ও জড়িয়ে পড়ে মেহনাজ রশীদ ও এবং খুনি ডালিমের ছোট ভাই কামরুল হক স্বপন। এরপর পুলিশি তৎপরতার কারণে যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় তারা।

কিন্তু এদের রক্তপিপাসু মনের কুপ্রবৃত্তি কখনো থামে না। এবার কৌশল বদলে ফেলে তারা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার কারণে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের মধ্যে ভিড়ে গিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য অপতৎপরতা চালাতে শুরু করে এই চক্রের অন্য সদস্যরা। অস্ট্রেলিয়ায় থেকে তাদের এসব বাংলাদেশবিরোধী অপতৎপরতায় নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে খুনি ফারুকের ছেলে ও এই চক্রের বর্তমান অফিসিয়াল প্রধান সৈয়দ তারিখ রেহমান।

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here